← Back to blog

Writing · Bangla

তোমাকে - ০২ - ০৫

দেখতে দেখতে অনেকগুলো যুগ পার হয়েছে, তাই না? ‘দিন’ শব্দটা ব্যবহার করলে সময়ের আপেক্ষিকতা ঠিক যেনো বোঝানো যায় না। তোমার অনুপস্থিতির সময়গুলো আমার জন্যে অনেক বেশি প্রলম্বিত ছিল।

আজ বিকেল বেলা ঘর থেকে বের হয়ে যখন ব্যস্ত রাস্তা ধরে চুপচাপ হাঁটছিলাম আর ভেতরে ভেতরে নিজেকে ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছিলাম এই বলে যে, তোমার অনুপস্থিতি আমায় এতোটুকু বিচলিত করে না, আমায় এতোটুকু কষ্ট দেয় না- তখন তুমি কোথায় আছো, কি করছো, আমার জানতে ইচ্ছে হয়…

…এবং পরমুহূর্তেই ইচ্ছেটা আর হয় না। কারণ, মূল্যহীন ইচ্ছের মূল্য দেয়া আমি ভুলে যেতে পারছি আজকাল।

আমি তো জানতামই, তুমি থাকতে আসো নি। কিন্তু সেটা কি তুমিও জানতে না? তবু এমন করে আমার হাত ধরে সেদিন আকাশের রংধনু কেনো দেখিয়েছিলে?… না, দোষারোপ তোমায় করছি না। আমার ভেতরের বয়ে যাওয়া ঝড়গুলোর জন্যে আমি কাউকেই দোষারোপ করি না। নিজের কোন অবস্থার জন্যেই কাউকে দোষারোপ করতে হয় না- জীবন থেকে এই শিক্ষা আমি নিয়েছি তোমার সাথে দেখা হবার আগেই। আমি জানি, কেন এমনটা হয়েছে, যা তোমার জানা নেই, প্রয়োজনও নেই। তুমি শুধুই দম দেয়া পুতুলের ভূমিকা নিয়েছ মাত্র। দমের পুতুলের সাথে সখ্য পাতানো যায়, রাগ করাও যায়, তাতে পুতুলের কিছু যায় আসে না।

যে চলে যেতে চায়, তাঁকে ধরে রাখতে নেই, তাঁকে যেতে দিতে হয়- দেরিতে হলেও এই কথাটার মর্ম তোমায় হারিয়ে বুঝেছি। এজন্যে, কোন একদিন রাস্তার ওইপাশে তোমায় দেখতে পেলে এপার থেকেই উঁচু গলায় চিৎকার করে ধন্যবাদ জানিয়ে দেবো…

কারণ তোমার কাছে যাওয়ার জন্যে আমায় রাস্তা পার হতে হবে, শারীরিক পরিশ্রম হবে, সময় খরচ হবে- আর এই অবসরটুকু যেনো তোমার জন্যে আমার অবশিষ্ট না থাকে।

কেমন আছো তুমি- এই প্রশ্নটা তোমায় করতে ইচ্ছে করে না তেমন। কারণ ধরেই নিয়েছি তুমি ভালো আছো, যে কোনো অবস্থায় তুমি ভালো থাকবে। তোমার আশেপাশে তোমার যত্ন নেয়ার মানুষের অভাব কখনো ছিলো না, এখনো নেই। তাই, তুমি ভালো আছো কি না, এই প্রশ্নটা কিছুটা যেনো অবান্তর মনে হয় আমার কাছে।

কি ভাবছো? তোমার প্রতি রাগ থেকে এই কথাগুলো আমি লিখছি?

তোমার প্রতি কখনোই আমি রাগ করতে পারি নি। আজও পারি না। কিভাবে রাগ করবো, যাকে ভালোবাসা যায়, তাঁর প্রতি অন্যার রাগ ধরে রাখার মানুষ যে আমি নই। তবে ঐ যে অভিমানটা, অভিমানের জায়গায় ঠিকই আছে। অভিমান খুব স্পর্শকাতর একটা অনুভূতি। এই পৃথিবীতে অল্প কিছু মানুষের সাথেই এটা করা যায়। কতটা দূরেই না আজ তুমি চলে গিয়েছো, ভাবতে অবাক লাগতো কিছুদিন আগেও। এখন তেমনটা মনে হয় না। খুব ব্যস্ত হয়েছি যে আজকাল, এই ভারী চিন্তাগুলোর সময়টা কোথায়…

ওরা মনে করে, পুরো ব্যাপারটাই আমার মনগড়া কিছু একটা, আমাকে ওরা বলে ‘সত্যি কি এমন হয়েছিলো?’। আমি ওদের কিছুই বলি না, ওরা ধরে নেয়, সবই আমার কল্পনা, আমাকে সান্ত্বনা দেয়, বলে ‘এবার সত্যি ওমন কিছু করে দেখা!’। ওরা জানে না, ওদের বলিও নি, বললে বিশ্বাস করবে না ওরা- কি সময়টাই না আমরা কাটিয়েছিলাম। স্বপ্নও হয়তো এতোটা সুন্দর হয় না। ওরা জানে না, একটা মুহুর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ মনে হয়েছিলো আমার। আমি নিশ্চিত, এই ধরাধামে ওইদিন ওই ক্ষণে আমার মতো সুখী মানুষ সম্ভবত দুটো ছিলো না। কোন সময়টা তুমি আন্দাজ করতে পারছো?… থাক, প্রয়োজন নেই।

এই পৃথিবীতে কেউই কারও জীবনে কোন কারন ছাড়া আসে না। তোমাকে তো আগেও বলেছি, আবারও বলছি- তুমি তোমার অজান্তেই কিছু একটা করে দিয়ে গিয়েছো, যেটা পরম শক্তি আমার জন্যে নির্ধারন করে দিয়ে গিয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ যে, উনি তোমাকে পাঠিয়েছিলেন। আর এজন্যেই তুমি কখনোই সারাজীবনের জন্যে পাশাপাশি থাকতে আসো নি, সেই মহাপরিকল্পকের পরিকল্পনাটা বাস্তব করে দিয়ে নিরবে সরে গিয়েছো।

কিন্তু আমি যে মানুষ, সাধু-সন্ত নই। তাই যখন তোমাকে ছাড়াই থাকতে হবে বুঝতে পেরেছিলাম, আমার সামনে দুটো রাস্তা ছিলো- আর দশজন মানুষের মতো ভাগ্যকে অভিশাপ দিতে দিতে, নিজেকে বাদে পৃথিবীর সবাইকে নিজের অপ্রাপ্তির জন্যে দোষারোপ করতে করতে মহাকালের পরিক্রমায় হারিয়ে যাওয়া; অথবা নিজের অন্তর্মূখী দানবের সাথের চিরকালের যুদ্ধে নামা, নিজের ভেঙে টুকরো টুকরো করে নতুন করে তৈরি করা। দ্বিতীয় আরেকবার এই পৃথিবীতে জন্মাতে পারলে হয়তো তোমাকে না পাওয়ার শোক দিবস যাপন করতে করতে এক জীবন পার করে দেয়া যেতো। কিন্তু সেই বিলাসিতা করার উপায় নেই যে।

আর তাই, অভিমানগুলো সব আজও বেঁচে আছে। আমিও হয়তো অন্য কোনো ঠিকানায় থিতু হবো, তবে তাতে করে তোমার অভিমানগুলোতে এতোটুকু আঁচড় পড়বে না।

আমাদের আবার দেখা হবে। যথাসময়ে। আমি নিশ্চিত।

তোমার মনে আছে, আমরা কোন বাসটাতে উঠে একসাথে কিছুদূর যেতাম? সেই বাসটায় বসে তোমার সাথে একটু বেশিক্ষণ থাকার জন্যে একটু দূরের স্টপেজ থেকে উঠতাম। তারপরেও কিভাবে রাস্তাগুলো চোখের পলকেই শেষ হয়ে যেতো, তাই না?

তুমি চলে যাবার পর আর সে বাসটায় আমি উঠি নি। ভেবো না তুমি নেই বলে উঠি নি; আমার প্রয়োজন হয় নি। তবে মাঝে মাঝে দূর থেকে বাসটাকে দেখি, তারপর মুখ ফিরিয়ে নেই। জানালার কাছে তুমি বসে আছো কি না, তা আমি আজ আর জানতে চাই না…

ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে আর লিখবো না।

তবে আমার এই না লিখার ভাবনাটাও তোমাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসবে, তা হয়তো নিশ্চিত ছিলাম। এইজন্যেই বোধহয় দুই দিনের ব্যবধানে দুবার তোমাকে দেখেছি।

না, বাস্তবে নয়, স্বপ্নে।

প্রথম স্বপ্নটা এরকমঃ

আমি একটা ঘরে উঁকি দিয়েছি। বেশ কয়েকজন মানুষ আছে সেখানে। সবাই কারো না কারো সাথে কথা বলছে। তবে সবার মধ্যমণি হয়ে আছো তুমি। কলাপাতা রংয়ের একটা শাড়ি পড়ে আছো। মাথায় টিকলির মতো কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। ঠোঁটে গ্লস দিয়েছো মনে হচ্ছে। সামনে কারো সাথে হেসে কথা বলছো। কি কথা বলছো, তা আমার জায়গা থেকে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে না। এটা কি কোন বিয়েবাড়ি? তোমার বিয়ে? ঠিক বুঝতে পারছিনা।

দ্বিতীয় স্বপ্নটা এরকমঃ

তুমি আমার সাথেই কথা বলছো এবার। তবে ঠিক কি বলছো, তা মনে নেই আর। এক জায়গায় শুধু তুমি আমাকে সদ্য কেনা গাড়িটা দেখাতে চেয়েছিলে। বলছিলে, এই নিয়ে তোমার দুটো গাড়ি হলো। আরেকটা গাড়ি কোথায় রেখছো, খোঁজ করছিলে এক পর্যায়ে।

আপাত দৃষ্টিতে বেশ সাধারণ স্বপ্ন। কাউকে নিয়ে চিন্তা করলে সে স্বপ্নে দেখা দেয় নাকি। এই লিখাটি যখন আমি লিখছি, তখনো পর্যন্ত ফ্রয়েডের স্বপ্ন নিয়ে লিখা বইটা পড়া হয়নি। আপাতত তার প্রয়োজনও দেখছি না।

কারণ, বপ্ন ব্যাখ্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে বহু গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার নিয়ে আমাকে এখন চিন্তা করতে হবে।

আপাতত, যেখানে এখন আছো, সেখানেই থাকো-

আমার চোখের অন্তরালে।

On this page